দেবরাজ সাহা : বাংলা সাহিত্য, সমাজসেবা এবং পরিবেশ সচেতনতার জগতে কিছু মানুষ নীরবে তাঁদের কাজের মাধ্যমে সমাজে গভীর ছাপ রেখে যান। হাওড়ার বাগনানের বাসিন্দা চন্দ্রনাথ বসু তেমনই এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। সাহিত্যচর্চা, বৃক্ষরোপণ, সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রসারে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা তাঁকে মানুষের কাছে এক অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছে। সকলের কাছে তিনি অধিক পরিচিত ‘গাছ কাকু’ নামে।সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য সংকলন, স্মারকগ্রন্থ এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশনায় নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও মানবিক অনুভূতির প্রতিফলন ঘটে, অন্যদিকে তেমনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্র নয়, বরং সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

তবে সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই তাঁকে বিশেষভাবে আলাদা করেছে। বৃক্ষরোপণকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রতিদিন অন্তত একটি গাছ লাগানোর সংকল্প নিয়ে তিনি বছরের পর বছর কাজ করে চলেছেন। তাঁর উদ্যোগে রোপিত ও বিতরণ করা গাছের সংখ্যা ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়। এই কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাই ছড়িয়ে দেননি, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্নকেও বাস্তব রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।চন্দ্রনাথ বসুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর ব্যতিক্রমী উপহার সংস্কৃতি। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, সাহিত্যসভা, জন্মদিন, বিবাহ অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ উপলক্ষে তিনি বই এবং গাছ উপহার দিতে ভালোবাসেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি বই মানুষের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে, আর একটি গাছ ভবিষ্যতের জন্য জীবন ও আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। জ্ঞানচর্চা এবং পরিবেশ সচেতনতার এই অনন্য মেলবন্ধন তাঁকে সমাজে এক স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দিয়েছে।

সমাজসেবার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া তাঁর নিত্যদিনের কাজের অংশ। মানুষের কল্যাণে তাঁর অকৃত্রিম নিষ্ঠা তাঁকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে।জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদ্যাপনেও তিনি অত্যন্ত সক্রিয়। এসব দিবসকে তিনি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না; বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সমাজ সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার এক সুন্দর সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের বিকাশ ও প্রসারেও তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। নবীন লেখকদের উৎসাহ প্রদান, সাহিত্যচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। তাঁর কর্মস্পৃহা ও সাংগঠনিক দক্ষতা বহু সাহিত্যপ্রেমী মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

আজকের আত্মকেন্দ্রিক সমাজে চন্দ্রনাথ বসুর জীবনদর্শন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি দেখিয়েছেন, কলম যেমন মানুষের চেতনাকে আলোকিত করতে পারে, তেমনি একটি গাছের চারাও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। সাহিত্য, মানবতা এবং পরিবেশ—এই তিনের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনুকরণীয় জীবনপথ।বাগনানের প্রিয় ‘গাছ কাকু’ চন্দ্রনাথ বসু তাই শুধু একজন সাহিত্যিক বা সমাজসেবক নন; তিনি এক সবুজ আন্দোলনের পথিকৃৎ, মানবিক মূল্যবোধের ধারক এবং আলোকিত সমাজ গঠনের এক স্বপ্নসাধক। তাঁর কর্মপ্রেরণা আগামী প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।