বায়ুমণ্ডল গবেষণায় মেদিনীপুরের মুকুটে নতুন পালক, সফল রেডিওসাউন্ড উৎক্ষেপণ বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের!
নিজস্ব সংবাদদাতা :পূর্ব ভারতে বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণা এবং উপগ্রহ-তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ (CES)-এর উদ্যোগে এবং ISRO-র ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (NRSC)-এর সহযোগিতায় রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হল উন্নত GPS-Aided রেডিওসাউন্ড পেলোড। ৩০ আগস্ট দুপুর ১টায় এই উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ছিল এই গবেষণা উদ্যোগের দ্বিতীয় সফল উৎক্ষেপণ।উচ্চ-উচ্চতার আবহাওয়া বেলুনের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা এই রেডিওসাউন্ডটি প্রায় ২৩.৮১৯ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছয়। এরপর প্রায় ৫৫ কিলোমিটার রৈখিক দূরত্ব অতিক্রম করে ঝাড়খণ্ডের পাথরা এলাকায় অবতরণ করে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার কর। উৎক্ষেপণের সূচনা করে তিনি বলেন, উন্নত পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের প্রসারে এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। NRSC-ISRO-র মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে আবহাওয়া গবেষণা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং উপগ্রহ ক্যালিব্রেশনের মতো জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলেও তিনি জানান।

গোটা গবেষণা উদ্যোগের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করেন CES-এর অধিকর্তা ড. যতিশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাণিজ্যকর দপ্তরের Additional Commissioner অজন্তা বন্দ্যোপাধ্যায়।রেডিওসাউন্ড উৎক্ষেপণের আগে গ্রাউন্ড স্টেশন ইন্টিগ্রেশন, সেন্সর ক্যালিব্রেশন, RF লিঙ্ক সিঙ্ক্রোনাইজেশন এবং প্রাক-উড্ডয়ন পরীক্ষা-সহ গোটা প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সৌম্যকান্তি পান্ডা, অভীক সাহা, সুমন দাস, চিন্ময় খাঁড়া, শুভদীপ বর্মন, রালী হাঁসদা, শম্ভুনাথ জানা, দয়াল রানা, প্রতীক দে ও উৎপল বাগ। তাঁদের তত্ত্বাবধানে উড্ডয়ন চলাকালীন রিয়েল-টাইম টেলিমেট্রি তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কার্তিক বেরা, রিমোট সেন্সিং ও GIS বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমৃত কামিল্যা, অনিমেষ মাজি-সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মী ও গবেষকরা।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০ গ্রামেরও কম ওজনের এই হালকা সেন্সর ও টেলিমেট্রি ব্যবস্থা একটি প্রায় ৮০০ গ্রামের ল্যাটেক্স আবহাওয়া বেলুনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বেলুনটি ট্রপোস্ফিয়ার পেরিয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে যায়। সেখানে পৌঁছে বেলুনটি স্বাভাবিক নিয়মে ফেটে যায় এবং সংযুক্ত প্যারাসুটের মাধ্যমে পেলোডটি নিরাপদে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে।এই রেডিওরেডিওসাউন্ড-এর মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, বায়ুর তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং GPS ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বায়ুপ্রবাহের গতি ও দিকের তথ্য। সংগৃহীত তথ্য রিয়েল-টাইমে রেডিও লিঙ্কের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল ওয়ার্কস্টেশনে পাঠানো হয়।

এই গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ISRO-র INSAT-3D ও INSAT-3DR উপগ্রহের সাউন্ডার ডেটার নির্ভুলতা যাচাই করা। পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গে কালবৈশাখীর মতো তীব্র ঝড়ের আগাম পূর্বাভাসের জন্য বায়ুমণ্ডলের তাপগতীয় অস্থিরতা ও উইন্ড শিয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলের কার্যকারিতা বাড়ানোও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো অভিযানটি নিরাপদভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। রেডিওসোন্ড পেলোডে কোনও ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা বিস্ফোরক উপাদান নেই।বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাফল্য শুধু মেদিনীপুর নয়, পূর্ব ভারতের বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় আবহাওয়া সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।