নিজস্ব সংবাদদাতা : জঙ্গলমহলের গভীর অরণ্যে বিজ্ঞানের নতুন সংযোজন। অযোধ্যা পাহাড়ের স্যাঁতসেঁতে, ছায়াঘেরা পাথুরে ফাটলে আবিষ্কৃত হল একেবারে নতুন উদ্ভিদ প্রজাতি। বিস্ময়করভাবে, যার প্রস্থ মাত্র এক মিলিমিটার। তবু গুরুত্বে কোনও অংশে কম নয়। বাংলার প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক Ishwar Chandra Vidyasagar-এর নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে—Solenostoma vidyasagariensis।২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ বিজ্ঞান পত্রিকা Phytotaxa-য় আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রজাতির বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে। পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জুড়ে বিস্তৃত জঙ্গলমহল এলাকায় দীর্ঘ ক্ষেত্রসমীক্ষার পর এই সাফল্য আসে। গবেষণায় নেতৃত্ব দেয় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের দল, সহযোগিতায় ছিল

Botanical Survey of India (বিএসআই)।নতুন প্রজাতিটি মার্চান্টিওফাইটা বিভাগের অন্তর্গত—যা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূমি উদ্ভিদ গোষ্ঠীর অন্যতম। এটি প্লেকটোকোলিয়া উপজাতির একটি লিভারওয়ার্ট। লিভারওয়ার্ট সাধারণত আর্দ্র পরিবেশে জন্মানো ক্ষুদ্র ব্রায়োফাইট, যাদের আকার ছোট ও গঠন সরল হওয়ায় সহজে চোখে পড়ে না। অথচ উদ্ভিদের স্থলজ অভিযাত্রার বিবর্তনীয় ইতিহাসে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।মাত্র ১ মিলিমিটার প্রস্থের এই উদ্ভিদ আর্দ্র মাটির উপর সূক্ষ্ম সবুজ আস্তরণ তৈরি করে, প্রায় অদৃশ্যের মতো বনের মেঝের সঙ্গে মিশে থাকে।

ডিম্বাকৃতি পাতা, পৃষ্ঠীয় ভিত্তির বিশেষ গঠন এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রে স্পষ্ট দেখা যায় এমন স্বতন্ত্র ‘ক্রেনুলেট ও ল্যামেলেট-রেটিকুলোয়েড’ অলঙ্করণযুক্ত স্পোর—এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একে নিকটাত্মীয় Solenostoma truncatum থেকে আলাদা করেছে। এই স্বতন্ত্র গঠনগত বৈশিষ্ট্যই গবেষকদের নিশ্চিত করে যে এটি বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি।

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল, সঙ্গে গবেষক এস.কে. রশিদুল ইসলাম এবং বিএসআই-এর দেবেন্দ্র সিং। বিশদ রূপগত বিশ্লেষণ ও শ্রেণিবিন্যাসগত তুলনার পর সমকক্ষ-পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রবন্ধটি প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়।‘Vidyasagariensis’ নামকরণ কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, প্রতীকীও বটে। উনিশ শতকে শিক্ষা সংস্কার, নারী অধিকার ও সামাজিক পুনর্জাগরণে বিদ্যাসাগরের যে ভূমিকা, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই নাম। যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবিষ্কারের সূত্রপাত, সেটিও তাঁর নামেই—ফলে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।

শুধু শ্রেণিবিন্যাসগত গুরুত্বই নয়, এই প্রজাতির সম্ভাব্য ব্যবহারিক দিকও রয়েছে। গবেষকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, উদ্ভিদটি কিছু ভাইরাস ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখায়। ফলে ভবিষ্যতে ঔষধি গুণসম্পন্ন জৈব-সক্রিয় যৌগ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।