Skip to content

নিপা আতঙ্কে রাজ্য! বারাসতে দুই নার্স আক্রান্ত, কড়া নজরে স্বাস্থ্যদফতর

নিজস্ব সংবাদদাতা :কেরলের পর এবার বাংলায় নিপা ভাইরাসের হদিশ ঘিরে চরম উদ্বেগ। বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত দুই নার্সের শরীরে নিপা ভাইরাস পাওয়া গিয়েছে বলে স্বাস্থ্যদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। ১১ জানুয়ারি কল্যাণীর AIIMS-এর ভাইরাস রিসার্চ ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় নিপা ভাইরাসের প্রাথমিক উপস্থিতি ধরা পড়ে। চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে পুণের ল্যাবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকও নড়েচড়ে বসেছে। দিল্লি থেকে বিশেষ প্রতিনিধি দল আজই বাংলায় আসছে বলে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই নিপা আক্রান্ত নার্সদের সংস্পর্শে আসা এক চিকিৎসক-সহ দু’জন নার্স, একজন সাফাই কর্মী ও একজন অ্যাম্বুলেন্স চালককে কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্ত নার্স অসুস্থ অবস্থায় কাটোয়ায় কার কার সংস্পর্শে এসেছিলেন, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। নিপা আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের স্বাস্থ্যের উপর কড়া নজর রাখছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক।

ঘটনাক্রমে জানা যায়, ২ জানুয়ারি ওই নার্স শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কাটোয়ার এক চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা করান। চিকিৎসক সিদ্ধেশ্বর গুপ্ত বলেন,
“এক তরুণী এসেছিলেন, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে জ্বর বা গা-ব্যথার মতো অস্বাভাবিক কোনও উপসর্গ তখন চোখে পড়েনি।”

৩ জানুয়ারি ফের সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তরুণীকে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানেই পরীক্ষার পর নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

আক্রান্ত তরুণী পেশায় নার্স এবং তিনি বারাসতের ওই বেসরকারি হাসপাতালেই কর্মরত। জানা গিয়েছে, তাঁর গ্রামের বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের কোঁয়ারপুরে। ৩১ ডিসেম্বর তিনি চাকরির পরীক্ষা দিতে গুসকরা শহরে গিয়েছিলেন। কাটোয়ায় ফ্ল্যাট থাকলেও তিনি গ্রামের বাড়িতেই গিয়েছিলেন।

স্বাস্থ্যদফতরের কর্মীরা আক্রান্ত নার্সের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তালা ঝুলিয়েছেন। পাশাপাশি, পঞ্চায়েতের উদ্যোগে বাড়ির আশপাশের এলাকা স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কায় কাটোয়া হাসপাতালের ৬ জন ও বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের ৪৮ জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে নিপা আক্রান্ত দুই স্বাস্থ্যকর্মীই ভেন্টিলেশনে রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে খোঁজখবর নেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা। সোমবার সাংবাদিক বৈঠক করে বাংলায় দু’জনের নিপা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম। বাংলায় ফের নিপা ভাইরাসের হদিশে আতঙ্ক ছড়ালেও স্বাস্থ্যদফতর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকারই পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞের মতে, যাঁরা—

  • জঙ্গলের আশপাশে থাকেন
  • শুকরের খামার রয়েছে এমন এলাকায় বসবাস করেন
  • বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে আসেন

তাঁদের মধ্যে কারও যদি জ্বর, সর্দি, কাশি, শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে নিপার সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। এই কারণেই স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রথমেই জানতে হবে রোগী কোন এলাকা থেকে এসেছেন।

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে সাধারণ জ্বরের মতোই লক্ষণ দেখা যায়—

  • জ্বর
  • সর্দি-কাশি
  • গা, হাত-পা ব্যথা

কিন্তু ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যেই সংক্রমণ মারাত্মক আকার নিতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে—

  • বিভ্রান্তি
  • ভুলভাল কথা বলা
  • মানসিক আচরণে অস্বাভাবিকতা

এই পর্যায়ে রোগী দ্রুত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।

ভাইরোলজিস্ট শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক জানান, নিপা একটি ছোঁয়াচে রোগ

  • এটি মূলত পশু থেকে মানুষের শরীরে আসে
  • পরে আক্রান্ত মানুষের লালার মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে

সবচেয়ে বড় বাহক হল বাদুড়। বাদুড় কোনও ফল কামড়ে বা অর্ধেক খেলে, সেই ফলে তার লালা লেগে যায়। সেই ফল ভালভাবে না ধুয়ে খেলে নিপা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে

কী করবেন, কী করবেন না?

✔️ ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন
✔️ জ্বর হলে আতঙ্ক নয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
❌ অযথা গুজবে কান দেবেন না
❌ উপসর্গ লুকিয়ে রাখবেন না

নিপা নতুন নয় বাংলার কাছে। আগেও রাজ্যে এর হানা মিলেছে। তবে সতর্কতা আর সচেতনতা থাকলেই বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। আতঙ্ক নয়, তথ্যই হোক হাতিয়ার— এই বার্তাই দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Latest