Skip to content

সভ্যতার মুখোমুখি আশাপূর্ণা দেবী! — দেবরাজ সাহা

“নারী ছলনাময়ী, নারী জন্ম অভিনেত্রী। কিন্তু সে কি শুধু পুরুষজাতিকে মুগ্ধ করবার জন্যে? বিভ্রান্ত করবার জন্যে? বাঁচবার জন্যে নয়? আশ্রয় দেবার জন্যে নয়?” — আশাপূর্ণা দেবী

সময় বদলায়। সমাজ বদলায়। সভ্যতার সংজ্ঞাও যুগে যুগে নতুন অর্থ লাভ করে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অর্থনীতির প্রসার, শিক্ষার বিস্তার কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান আমাদের বারবার আশ্বস্ত করে যে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিন্তু ইতিহাসের কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও আমাদের সামনে একইরকম অস্বস্তিকর হয়ে ফিরে আসে। নারীর স্বাধীনতা সেই প্রশ্নগুলির অন্যতম। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা বহুবার দেওয়ার চেষ্টা করেছি, অসংখ্য আইন প্রণয়ন করেছি, নীতিনির্ধারণ করেছি, ক্ষমতায়নের নতুন ভাষ্য নির্মাণ করেছি। তবুও কোথাও যেন এক গভীর অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। কারণ উন্নয়নের সূচক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান পরিমাপ করতে পারে, কিন্তু সমাজের মনন, মূল্যবোধ এবং মানসিকতার পরিবর্তনকে সংখ্যায় মাপা যায় না। আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য আজও আমাদের কাছে কেবল নন্দনতত্ত্বের বিষয় নয়; বরং সমাজ-আত্মসমালোচনার এক নির্মম দলিল। তাঁর রচনাগুলি পড়লে মনে হয়, সময় বদলেছে, পোশাক বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মানুষের মানসিকতার বহু স্তর আজও সেই পুরোনো অন্ধকারে আবৃত। আশাপূর্ণা দেবী কখনও সমাজ পরিবর্তনের জন্য স্লোগান লেখেননি। তিনি কোনও রাজনৈতিক মতবাদের মুখপাত্র ছিলেন না। তাঁর কলমে ছিল না উত্তেজনার ভাষা, ছিল না ক্ষণস্থায়ী আবেগের বিস্ফোরণ। অথচ তাঁর সাহিত্য নীরবে এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যার উত্তর দিতে আজও সমাজ অস্বস্তি বোধ করে। কারণ তিনি জানতেন, অন্যায় যখন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন তা সমাজের চোখে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বৈষম্য যখন সংস্কারের নাম পায়, তখন মানুষ তাকে আর বৈষম্য বলে চিনতে পারে না। সেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠা অন্যায়ের মুখোশ খুলে দেওয়াই ছিল তাঁর সাহিত্যসাধনার অন্যতম লক্ষ্য। সমাজের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই যে নারীকে আমরা দেবীর আসনে বসাতে শিখেছি, কিন্তু মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে পারিনি। পূজার আসনে স্থান দেওয়া সহজ; সমান আসনে বসানো কঠিন। কারণ পূজিত মানুষ প্রশ্ন করে না, প্রতিবাদ করে না, নিজের অধিকার দাবি করে না। কিন্তু একজন মানুষ নিজের স্বপ্নের স্বীকৃতি চায়, নিজের মত প্রকাশ করতে চায়, নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার চায়। আশাপূর্ণা দেবী এই সহজ অথচ অস্বস্তিকর সত্যটিকেই আমাদের সামনে উন্মোচন করেছিলেন। তিনি কখনও চাননি নারী পুরুষকে পরাজিত করুক। তিনি চেয়েছিলেন, নারী যেন নিজের ভয়কে পরাজিত করে। তিনি কখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাজ কল্পনা করেননি; তিনি কল্পনা করেছিলেন সহমর্যাদা, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সম্মানের সমাজ। তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন অবাধতা নয়, আবার অন্ধ আনুগত্যও নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের বিবেককে অনুসরণ করার অধিকার, নিজের স্বপ্নকে সম্মানের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখার সাহস এবং নিজের অস্তিত্বকে অন্যের অনুমতির উপর নির্ভরশীল না করে তোলার শক্তি। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই নারীর স্বাধীনতাকে কিছু বাহ্যিক চিহ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। মনে করি, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশই মুক্তি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাই ক্ষমতায়নের চূড়ান্ত রূপ, কিংবা সামাজিক দৃশ্যমানতাই সমতার একমাত্র প্রমাণ। কিন্তু আশাপূর্ণা দেবীর দৃষ্টি ছিল আরও গভীরে। তিনি বুঝেছিলেন, ঘরের দরজা খুলে দিলেই মননের দরজা খুলে যায় না। একজন নারী বাইরে বেরোতে পারলেও যদি নিজের মত প্রকাশ করতে না পারেন, যদি তাঁর সিদ্ধান্ত বারবার অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকে, যদি তাঁর স্বপ্নকে এখনও বিলাসিতা বলে মনে করা হয়, তবে সেই স্বাধীনতা কেবল বাহ্যিক; অন্তরের নয়। আজও আমাদের চারপাশে অদ্ভুত এক সামাজিক বৈপরীত্য দৃশ্যমান। একটি ছেলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখলে তাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলা হয়; একটি মেয়ে একই স্বপ্ন দেখলে অনেক সময় তাকে স্বার্থপর বলে চিহ্নিত করা হয়। একটি ছেলে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে তাকে আত্মবিশ্বাসী বলা হয়; একটি মেয়ে একই দৃঢ়তা দেখালে তাকে অবাধ্য, উদ্ধত কিংবা সংসারবিমুখ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ভাষা বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু বিচার করার মানদণ্ড কি সত্যিই বদলেছে? আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য আজও আমাদের বিবেকের সামনে এই প্রশ্নটিই রেখে যায়। নারীর প্রতি বৈষম্য সবসময় কঠোর ভাষায় প্রকাশ পায় না। অনেক সময় তা স্নেহের ভাষায় আসে, দায়িত্বের নামে আসে, ভালোবাসার অজুহাতে আসে। বলা হয়—"তোমার ভালোর জন্য", "সংসারের শান্তির জন্য", "সমাজ কী বলবে"। এই কয়েকটি বাক্য কত শত স্বপ্নকে যে জন্মের আগেই নির্বাসিত করেছে, তার হিসাব কোনও ইতিহাস সংরক্ষণ করে না। আশাপূর্ণা দেবী সেই নীরব নির্বাসনের ইতিহাসই লিখেছেন অভিযোগের ভাষায় নয়, সত্যের ভাষায়।

কিন্তু আজকের সময় আমাদের সামনে আরও এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা উপস্থিত করেছে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, গার্হস্থ্য হিংসা, পণপ্রথার বলি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, সাইবার হেনস্তা, অ্যাসিড হামলা কিংবা নারী পাচারের খবর। কোনও দিন পথ চলতে গিয়ে, কোনও দিন কর্মক্ষেত্রে, কোনও দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আবার কোনও দিন নিজের ঘরেই নারী নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। সভ্যতার অগ্রগতির দাবি যত জোরালো হয়েছে, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের নির্মমতাও যেন তত বেশি আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বহু ক্ষেত্রেই অপরাধের চেয়ে বেশি বিচার করা হয় নির্যাতিত নারীকে। তাঁর পোশাক, তাঁর চলাফেরা, তাঁর সময়, তাঁর সিদ্ধান্ত—সবকিছুকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অপরাধীর মানসিকতার বিশ্লেষণের পরিবর্তে সমাজ প্রায়ই ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা কেবল অন্যায় নয়; এটি সভ্যতার চরম ব্যর্থতার পরিচয়। যে সমাজ অপরাধীর পরিবর্তে নির্যাতিতকে প্রশ্ন করে, সেই সমাজ প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচারের ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। নারীর উপর অত্যাচার কেবল শারীরিক নয়; মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নও সমান ভয়ঙ্কর। বহু নারী আজও নিজের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার পান না, নিজের পেশা নির্বাচন করতে পারেন না, সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের শ্রমকে কর্তব্য বলা হয়, কিন্তু সেই শ্রমের মূল্যকে সম্মান করা হয় না। এই অদৃশ্য বৈষম্যই সমাজের সবচেয়ে গভীর অসুখ। আশাপূর্ণা দেবী বহু আগেই বুঝেছিলেন, নারীর মুক্তির লড়াই কেবল আইনের লড়াই নয়; এটি চেতনার লড়াই। আইন অপরাধের শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে না। সেই কাজ করতে পারে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং মানবিক মূল্যবোধ। তাই তাঁর সাহিত্য আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি জানতেন, সমাজের পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের ভেতর থেকে। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নতি তখনই ঘটে, যখন সেখানে নারীর ত্যাগকে কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয় না; বরং তাঁর স্বপ্ন, ইচ্ছা, প্রতিভা এবং ব্যক্তিসত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংসার কেবল দায়িত্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং স্বীকৃতির উপর। যেখানে একজন মানুষের স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত বিসর্জন দিতে হয়, সেখানে সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সমতা জন্ম নেয় না।

আজ প্রয়োজন কেবল নারীদের ক্ষমতায়নের নয়; প্রয়োজন সমাজের মননকে মানবিক করে তোলার। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে সম্মান কোনও লিঙ্গভিত্তিক গুণ নয়; এটি মানবিকতার প্রথম পাঠ। একটি মেয়ের স্বপ্নকে যেমন মর্যাদা দিতে হবে, তেমনি একটি ছেলেকেও শেখাতে হবে সমতা কোনও দয়া নয়, কোনও অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের জন্মগত অধিকার। যে সমাজ এই পাঠ ভুলে যায়, সে সমাজ উন্নত হতে পারে, কিন্তু কখনও মহৎ হতে পারে না। আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য আমাদের আজও শেখায় নারীর মুক্তির প্রশ্ন আসলে সমাজের আত্মমুক্তির প্রশ্ন। নারীকে স্বাধীন করা নয়, তাঁকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেওয়াই সভ্যতার পরীক্ষা। কারণ স্বাধীনতা কাউকে দান করা যায় না; তাকে স্বীকার করতে হয়। আর যে সমাজ সেই স্বীকৃতি দিতে শেখে, কেবল সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে আলোকিত হয়।আশাপূর্ণা দেবীর প্রয়াণের বহু বছর পরেও তাঁর সাহিত্য আমাদের সামনে এক অনিবার্য প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যিই নারীকে স্বাধীন দেখতে চাই, নাকি আমাদের সুবিধামতো নির্ধারিত সীমার ভেতরেই তাঁর স্বাধীনতাকে বন্দি রাখতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কেবল সময়ের সঙ্গে এগোচ্ছি, নাকি সত্যিই সভ্য হয়ে উঠছি। সভ্যতার আসল পরিচয় অট্টালিকায় নয়, প্রযুক্তিতে নয়, অর্থনীতির উত্থানেও নয়; তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে একজন নারী কতখানি মর্যাদা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারছেন সেই বাস্তবতার মধ্যে।

Latest