Skip to content

শালবনি-মেদিনীপুরে কোটি টাকার জমি জালিয়াতি? তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য!

নিজস্ব সংবাদদাতা : পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি ও মেদিনীপুর ব্লকজুড়ে কথিত সরকারি জমি জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলাকে কেন্দ্র করে ক্রমশ জোরদার হচ্ছে তদন্ত। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে একের পর এক নতুন তথ্য। ইতিমধ্যেই এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুজয় হাজরা। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, এই মামলার সূত্র ধরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের নামও উঠে এসেছে।

অভিযোগ থেকেই তদন্তের সূত্রপাত

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার যুব তৃণমূল নেতা শেখ ইমরানের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ ছিল, জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুত জমি হস্তান্তর করা হয়নি। সেই অভিযোগের তদন্তে নেমে পুলিশ সুজয় হাজরাকে গ্রেফতার করে।তদন্তকারীদের দাবি, প্রাথমিকভাবে প্রতারণার অভিযোগ হিসেবে শুরু হওয়া তদন্তে পরে আরও বড় আকারের জমি দুর্নীতির সম্ভাবনা সামনে আসে। জমির নথি, রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখতে গিয়েই বহু কোটি টাকার জমি জালিয়াতির ইঙ্গিত মিলেছে বলে তদন্তকারী মহলের দাবি।

সরকারি জমির চরিত্র বদলের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, শালবনি ও মেদিনীপুর ব্লক এলাকায় প্রায় ৩০০ একর সরকারি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে তা প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সরকারি জমিকে প্রথমে রায়ত জমি হিসেবে দেখানো হয় এবং পরে নথিতে পরিবর্তন এনে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মালিকানা দেখিয়ে সেই জমি বিক্রি করা হয়।শালবনি থানার সীতারামপুর মৌজায় দশটি দাগ নম্বরে মোট ৪২০ ডেসিমেল জমি সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু সীতারামপুর নয়, কর্ণগড়-সহ ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দু'ধারে বিস্তীর্ণ এলাকাতেও একই ধরনের অনিয়ম ঘটেছে।

তদন্তের নজরে প্রভাবশালীরা?

তদন্তকারী মহলের অনুমান, এই ঘটনায় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন, নথি সংশোধন এবং বিক্রির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।সূত্রের খবর, প্রাক্তন বিধায়ক ছাড়াও শালবনি বিধানসভা এলাকার একাধিক রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এবং প্রশাসনিক স্তরের কিছু ব্যক্তির ভূমিকাও তদন্তের আওতায় এসেছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।

কেন আলোচনায় সুমিত রায়?

তদন্তকারী সূত্রের দাবি, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সুমিত রায়ের নাম সামনে আসে। তাঁর মোবাইল ফোনের শেষ লোকেশন ধরে কলকাতার একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। সেই সূত্রেই তদন্তকারীরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন সংলগ্ন এলাকাতেও পৌঁছেছিলেন বলে খবর।তবে এখনও পর্যন্ত সুমিত রায়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। তদন্তকারীরা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র খতিয়ে দেখছেন। উল্লেখ্য, এই সমস্ত অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হিসেবে পরিচিত বহু জমির মালিকানা আচমকাই পরিবর্তিত হতে শুরু করে। অভিযোগ, বনদফতরের উদ্যোগে যেসব জমিতে আগে ইউক্যালিপটাস চাষ হত এবং স্থানীয় মানুষ চাষাবাদ করতেন, পরবর্তীকালে সেই জমিগুলির চারপাশে পাঁচিল তুলে দখল নেওয়া হয়।সীতারামপুরের বাসিন্দা কৃষ্ণপদ রানা দাবি করেন, বনদফতরের দেওয়া চারা গাছ লাগানো জমিকেই পরে ব্যক্তিগত মালিকানার জমি হিসেবে দাবি করা হয়। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা জিতেন রায়ের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে বহু সরকারি জমি দখল করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের উচ্ছেদের চেষ্টাও হয়েছে।

রাজনৈতিক চাপানউতোর

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তাঁর দাবির সমর্থনে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি।অন্যদিকে মেদিনীপুরের বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর গুছাইত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেছেন, “সরকারি ও জনসাধারণের সম্পত্তি লুটের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

আদালতের নির্দেশ ও তদন্তের পরবর্তী ধাপ

গ্রেফতারের পর সুজয় হাজরাকে আদালতে পেশ করা হলে আদালত তাঁকে আট দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। তদন্তকারীদের আশা, জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারে।সরকারি আইনজীবী সৈয়দ নাজিম হাবিব জানিয়েছেন, সরকারি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ব্যক্তিগত মালিকানার জমি হিসেবে দেখানো, প্লট করে বিক্রি এবং প্রোমোটিংয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে তদন্তকারীরা জমির নথি, আর্থিক লেনদেন, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশদভাবে পরীক্ষা করছেন। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।

Latest