পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় ও লোকঐতিহ্যের অন্যতম বিস্ময় হয়ে উঠেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের মাদপুর গ্রামের মনসা মায়ের মেলা। গঙ্গাসাগর মেলার পর এটিকেই রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা বলে মনে করেন বহু ভক্ত ও স্থানীয় মানুষ। খড়গপুর লোকাল থানার অন্তর্গত ৩ নম্বর লছমাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের গোবিন্দনগর মৌজার মহিষা গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন মনসা মন্দির ঘিরে প্রতি বছর চৈত্র মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে এই অঞ্চল ছিল জকপুরের জমিদার যোগেশ্বর রায়-এর জমিদারির অন্তর্গত। এক ভোররাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান—চতুর্ভুজা মা মনসা তাঁকে নির্দেশ দেন, মহিষা গ্রামের জঙ্গলের একটি উইয়ের ঢিপিতে তিনি বিরাজ করছেন এবং সেখানে যেন যথাযোগ্য মর্যাদায় পুজোর ব্যবস্থা করা হয়।

পরদিন সূর্যোদয়ের পর জমিদার লোকজন নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে ওই স্থানেই নিয়মিত আরাধনার সূচনা করেন।আজও সেই উইয়ের ঢিপিই এই মন্দিরের মূল পূজাস্থল। পরে সেটিকে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো হয় এবং পাশের মাটি দিয়ে একটি লাল পদ্ম তৈরি করা হয়, যা দেবী মনসার প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়। এই মন্দিরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল—এখানে কোনও ছাদ নেই। বিশ্বাস, মা মনসা নিজেই নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি খোলা আকাশের নীচেই থাকতে চান। তাই যতবারই মন্দিরে স্থায়ী ছাউনি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই তা ভেঙে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।এখানে দেবীর কোনও মূর্তি নেই, নেই কোনও স্থায়ী পুরোহিত বা পান্ডা। ভক্তরাই নিজের হাতে উইয়ের ঢিপি ও পদ্মচিহ্নে ফুল, দুধ, কলা ও সিঁদুর নিবেদন করে পুজো দেন। বিশেষ করে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে। তবে চৈত্র মাসের তৃতীয় মঙ্গলবারের মেলার মাহাত্ম্য একেবারেই আলাদা।

ওই দিন গোটা গ্রামে কোনও বাড়িতে উনুন জ্বলে না—সব রান্না হয় পরের দিন। চক্রবর্তী পদবিধারী ব্রাহ্মণরা নিঃশব্দে উৎসর্গের আচার সম্পন্ন করেন, কোনও মন্ত্রোচ্চারণ ছাড়াই।এই মেলার আরেকটি বড় আকর্ষণ হল বিশেষ বলি প্রথা। স্থানীয়দের দাবি, ওই একদিনে প্রায় ৩০ হাজার ছাগ বলি দেওয়া হয়। পাশাপাশি মন্ত্রপূত জলে স্নান করিয়ে হলুদ মাখানো পায়রা উড়িয়ে দেওয়ারও বিশেষ রীতি রয়েছে।

হাঁস বলির চলও আছে, কখনও কখনও সেই হাঁস সামনের পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয়।একসময় সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় এই মনসা পুজোর প্রচলন শুরু হলেও বর্তমানে পুত্রসন্তান লাভ, চাকরি, রোগমুক্তি, সংসারের কষ্ট থেকে মুক্তি—নানা মনস্কামনা নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন।

শতাব্দী প্রাচীন এই লোকবিশ্বাস, আচার এবং অলৌকিকতার আবহই মাদপুরের মনসা মায়ের মেলাকে বাংলার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত করেছে।