ক্ষুদিরামের স্মৃতিধন্য ছেঁদাপাথর: জঙ্গলমহলের বুকে আজও অমলিন বিপ্লবের ইতিহাস!
নিজস্ব সংবাদদাতা : বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের ছেঁদাপাথর—নিঃশব্দ জঙ্গলে ঘেরা এই স্থান আজও বহন করে চলেছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গৌরবময় অধ্যায়। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুসহ তৎকালীন একাধিক বিপ্লবীর কর্মকাণ্ডের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই এলাকার সঙ্গে।১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন বয়সে ফাঁসির মঞ্চে শহিদ হন ক্ষুদিরাম বসু। ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণ বিপ্লবী অল্প বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। পরবর্তীতে অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে, জঙ্গলমহলের বাঁকুড়ার ছেঁদাপাথর অঞ্চলে বিপ্লবীরা গোপনে আশ্রয় নিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। বর্তমানে সেখানে গেলে দেখা যায় বিপ্লবীদের ব্যবহৃত পাথরের গুহার অস্তিত্ব। খনিজ উত্তোলনের কারণে সেই গুহাগুলির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ধ্বংসের মুখে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।এলাকার আরও একটি উল্লেখযোগ্য স্থান হল জঙ্গলের মধ্যে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকের জায়গা। বর্তমানে সেই স্থানটি বাঁধানো হয়েছে এবং সেখানে বিপ্লবীদের স্মরণে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত একটি গুহাকেও প্রশাসনের উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

মুজফ্ফরপুরের সেই ঘটনা : ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিপ্লবীদের উপর কঠোর অবস্থানের জন্য কিংসফোর্ড তাঁদের নিশানায় ছিলেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল মুজফ্ফরপুরে কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়।

কিন্তু ভুল গাড়িতে বোমা পড়ায় কিংসফোর্ড প্রাণে বেঁচে যান এবং দুই ব্রিটিশ মহিলা নিহত হন।ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী গ্রেফতার এড়াতে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে গ্রেফতার হন ক্ষুদিরাম। বিচারের পর তাঁর ফাঁসির সাজা হয়। শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠে দেশবাসীর কাছে অমর হয়ে যান এই তরুণ বিপ্লবী।ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর কর্মকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

তাঁদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে ঘিরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বাল গঙ্গাধর তিলক তাঁর সংবাদপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন এবং স্বরাজের দাবিকে আরও জোরালো করেন। এই অবস্থানের জন্য তাঁকেও ব্রিটিশ সরকারের রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল।পরবর্তী সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ও সাহসের প্রশংসা করেন। ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছেও হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার প্রতীক।ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগকে ঘিরে বাংলার লোকসংস্কৃতিতেও দেশাত্মবোধের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’-র মতো জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।আজও জঙ্গল ও পাথুরে ভূপ্রকৃতিতে ঘেরা ছেঁদাপাথর শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়—এটি বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থান। ক্ষুদিরাম বসু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের কথা আজও যেন নীরবে বলে যায় এই জঙ্গলমহল।