কিছু মানুষ ইতিহাসে জন্ম নেন। আবার কিছু মানুষ এমন হন, যাঁদের উপস্থিতিতে ইতিহাস নিজেই নতুন ভাষা খুঁজে নেয়। তাঁদের জীবন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সীমানায় আটকে থাকে না; তাঁরা পরিণত হন এক দীর্ঘস্থায়ী চেতনায়, এক নৈতিক উচ্চারণে, এক অবিরাম প্রশ্নে। সময় তাঁদের শরীরকে সরিয়ে দেয়, কিন্তু তাঁদের প্রয়োজনকে মুছে দিতে পারে না। বীরসা মুন্ডা সেই বিরল মানুষের একজন। তবে তাঁকে নিয়ে কথা বলার আগে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করা প্রয়োজন— আমরা কি সত্যিই তাঁকে স্মরণ করি, নাকি স্মরণ করার সামাজিক রীতিটুকু পালন করি? আমরা কি তাঁর সংগ্রামের গভীরতা বুঝতে চাই, নাকি তাঁর নামকে কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রতীকে পরিণত করেছি? বীরসা মুন্ডাকে বোঝার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয় তখনই, যখন তাঁকে কেবল অতীতের একজন বিদ্রোহী হিসেবে দেখা হয়। কারণ তিনি শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সংগ্রামী নন; তিনি এমন এক ধারণার নাম, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব, নিজের অধিকার, নিজের ভূমি, নিজের সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি নিজের মর্যাদাকে রক্ষার জন্য উঠে দাঁড়ায়। এই কারণেই আজ, একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত উন্নত ও দ্রুতগতির পৃথিবীতে, বীরসা মুন্ডা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছেন। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে উন্নয়ন প্রায় এক অনুচ্চারিত ধর্মে পরিণত হয়েছে। উঁচু অট্টালিকা, বিস্তৃত সড়ক, প্রযুক্তির গতি, তথ্যের বিস্ফোরণ, বাজারের সম্প্রসারণ এসবই অগ্রগতির ভাষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের অভিধানে একটি প্রশ্ন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে— এই উন্নয়ন কার জন্য? যখন সমাজের একাংশ অভূতপূর্ব সুযোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য একাংশ এখনও নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি, নিজের ভূমির নিরাপত্তা, নিজের কণ্ঠস্বরের অধিকার এবং ন্যূনতম সম্মানের জন্য লড়ছে। আমরা উন্নয়নের ফলাফল দেখি, কিন্তু তার বিনিময়ে কারা মূল্য দিচ্ছে সেই প্রশ্নকে প্রায়শই অস্বস্তিকর বলে এড়িয়ে যাই।আর ঠিক এই জায়গাতেই বীরসা মুন্ডা এসে আমাদের সামনে দাঁড়ান। তিনি মনে করিয়ে দেন মানুষকে পিছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন পূর্ণ হতে পারে না। যে অগ্রগতি মানুষের মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাকে উন্নয়ন বলা যায় না; যে সভ্যতা তার দুর্বলতম মানুষটির সম্মান রক্ষা করতে শেখে না, তার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষও নৈতিক দারিদ্র্যকে আড়াল করতে পারে না।বীরসা মুন্ডার সংগ্রামের সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। তিনি মানুষকে শুধু শাসকের বিরুদ্ধে নয়, নিজের ভেতরের পরাজয়বোধ, ভয় এবং দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত নীরবতার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। আজ এই শিক্ষা আমাদের আরও প্রয়োজন। কারণ আমরা এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মানতে শিখছি। আমরা বৈষম্য দেখি, কিন্তু তাকে বাস্তবতার অপরিহার্য অংশ বলে মেনে নিই। আমরা মানুষের কষ্ট দেখি, কিন্তু তাকে সংখ্যার ভাষায় অনুবাদ করি। সহানুভূতি ক্রমশ কমে আসে, সুবিধাবাদ ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই সময়ে বীরসা মুন্ডা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বীরসা মুন্ডাকে স্মরন করা জরুরি। আমরা ক্রমশ নিজের মাটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এখানে মাটি মানে শুধু ভূমি নয়; মাটি মানে শিকড়, স্মৃতি, সংস্কৃতি, সম্পর্ক এবং নিজের মানবিক অবস্থান। মানুষ আজ পৃথিবীর সঙ্গে সহাবস্থানের সম্পর্কের বদলে ভোগের সম্পর্ক গড়ে তুলছে। বীরসা মুন্ডা যেন এই সময়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে পৃথিবী মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্বের ক্ষেত্র। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো স্লোগানে বন্দি নয়। আজ আমরা ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল, শ্রেণি, মতাদর্শ অসংখ্য পরিচয়ে বিভক্ত। কিন্তু এই বিভাজনের মধ্যেও মানুষের সাধারণ যন্ত্রণা, সাধারণ অধিকার এবং সাধারণ সম্মানকে মনে রাখার যে নৈতিক শক্তি, তারই এক উজ্জ্বল প্রতীক বীরসা মুন্ডা। তাঁকে কেবল একটি সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করা হয়। তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর, তিনি বঞ্চনার বিরুদ্ধে উচ্চারিত নৈতিক প্রতিবাদ, তিনি মানুষের মর্যাদাকে কেন্দ্র করে নতুন সমাজ কল্পনার এক আহ্বান। তাই আজ তাঁকে নতুন করে আবারও পড়া দরকার। পাঠ্যবইয়ের তথ্য হিসেবে নয়, আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার ভাষা হিসেবে নয়; বরং বর্তমানকে বোঝার এক আয়না হিসেবে। কারণ ইতিহাসের প্রকৃত মূল্য তখনই থাকে, যখন তা বর্তমানকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে শেখায়।বীরসা মুন্ডা আজও যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন—আমাদের উন্নয়ন কি সত্যিই মানুষের? আমাদের স্বাধীনতা কি সকলের? আমাদের সভ্যতা কি মর্যাদার উপর দাঁড়িয়ে আছে? যতদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় এবং নৈতিক স্বচ্ছতায় দিতে না পারব, ততদিন বীরসা মুন্ডা কেবল ইতিহাস হয়ে থাকবেন না, তিনি প্রয়োজন হয়ে থাকবেন। তিনি অতীত নন। তিনি একটি বিবেক।তিনি একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন। তিনি আমাদের সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব আয়না। আর সেই কারণেই, তাঁর দেখিয়ে যাওয়া মানবিক সাহস আজও আমাদের সমাজের গভীরতম প্রয়োজন। — দেবরাজ সাহা (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গল্পকার)
উন্নয়নের যুগে বীরসা মুন্ডার প্রত্যাবর্তন!