নিজস্ব সংবাদদাতা: ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিশরের একটি বাতিল গোল এবং অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টি না পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যাচের দুটি গুরুত্বপূর্ণ VAR সিদ্ধান্ত নিয়ে সাবেক ফুটবলার, রেফারিং বিশেষজ্ঞ ও সমর্থকদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
৫৮ মিনিটে মিশরের দ্বিতীয় গোল কেন বাতিল হয়?
ম্যাচের ৫৮ মিনিটে মিশর দ্বিতীয় গোল করার পর ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউয়ের পরামর্শ দেয়। রিপ্লে দেখে রেফারি গোলটি বাতিল ঘোষণা করেন। VAR-এর পর্যালোচনায় দেখা যায়, গোল হওয়ার প্রায় ২১ সেকেন্ড আগে একই আক্রমণের সূচনায় মিশরের এক খেলোয়াড় মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধে ফাউল করেছিলেন। ওই ফাউলের পরও বলের দখল মিশরের কাছেই ছিল এবং আক্রমণটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। পরে সেই একই আক্রমণ থেকে গোল হওয়ায় রেফারি মনে করেন, আক্রমণের ভিত্তিই অবৈধ ছিল। ফলে গোলটি বাতিল করা হয়।

নিয়মের আলোকে সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক?
ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা IFAB-এর VAR প্রোটোকল অনুযায়ী, গোলের আগে একই Attacking Possession Phase (APP)-এ আক্রমণকারী দলের কোনো ফাউল সংঘটিত হয়ে থাকলে এবং সেটি গোল তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখলে VAR সেই ঘটনা পর্যালোচনা করে গোল বাতিলের সুপারিশ করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রেফারির সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি বর্তমান VAR প্রোটোকলের মধ্যেই রয়েছে।
ফাউলটি নিয়ে কেন বিতর্ক?
রিপ্লে অনুযায়ী, মারওয়ান আতিয়া বলের দখল নেওয়ার সময় লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে শরীরের চাপে ভারসাম্য হারাতে বাধ্য করেন। রেফারির মতে, এটি ছিল প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে বাধা দেওয়া, যা ফাউল হিসেবে গণ্য হয়। তবে অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের দাবি, ঘটনাটি গোলের অনেক আগে এবং মাঠের অনেক দূরে ঘটেছিল। তাদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ও দূরত্ব অতিক্রম করার পর একই আক্রমণকে ধরে গোল বাতিল করা VAR-এর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের উদাহরণ। অন্যদিকে রেফারিং বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, যেহেতু আক্রমণটি ভাঙেনি এবং বলের দখল একই দলের কাছেই ছিল, তাই বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী VAR-এর হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য।

সালাহর পেনাল্টি দাবি কেন নাকচ?
ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মিশরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ পড়ে গেলে মিশরের খেলোয়াড়রা জোরালোভাবে পেনাল্টির দাবি জানান। তবে রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং VAR-ও অন-ফিল্ড রিভিউয়ের প্রয়োজন মনে করেনি।
রেফারি ও VAR-এর মূল্যায়ন ছিল—
- আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার প্রথমে বলে বৈধভাবে ট্যাকল করেছিলেন।
- পরবর্তী শারীরিক সংস্পর্শকে স্বাভাবিক বা incidental contact হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- সালাহ তখন কার্যত বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
- রেফারির সিদ্ধান্তে clear and obvious error ছিল না বলে VAR অন-ফিল্ড রিভিউয়ের সুপারিশ করেনি।

ফুটবলের আইন কী বলছে?
IFAB-এর Laws of the Game অনুযায়ী, ডিফেন্ডার অসতর্ক, বেপরোয়া বা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে ফাউল করলে তবেই পেনাল্টি দেওয়া হয়। রেফারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বলে আগে বৈধ ট্যাকল হওয়ায় এবং পরবর্তী সংস্পর্শকে ফাউল হিসেবে বিবেচনা না করায় পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আইনসম্মত ছিল। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। মিশর শিবির এবং অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের দাবি, সালাহর পায়ে স্পষ্ট সংস্পর্শ হয়েছিল এবং অন্তত VAR-এর রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে কয়েকজন সাবেক আন্তর্জাতিক রেফারির মতে, রিপ্লে বিশ্লেষণে বলে আগে বৈধ ট্যাকল হওয়ায় পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য।
উল্লেখ্য, ম্যাচের দুটি VAR সিদ্ধান্তই বিশ্ব ফুটবলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান IFAB VAR প্রোটোকল অনুসারে গোল বাতিল ও পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি থাকলেও, নিয়মের প্রয়োগ কতটা ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ছিল—সেই প্রশ্নে মতভেদ রয়ে গেছে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ম্যাচটি ভবিষ্যতেও VAR-এর সীমা, ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।