১০৩০ বছরের ঐতিহ্যে ৯ তোপধ্বনি, বিষ্ণুপুর মল্লরাজবাড়িতে শুরু মৃন্ময়ী দেবীর পুজো!

১০৩০ বছরের ঐতিহ্যে ৯ তোপধ্বনি, বিষ্ণুপুর মল্লরাজবাড়িতে শুরু মৃন্ময়ী দেবীর পুজো!

নিজস্ব সংবাদদাতা : ঐতিহ্যের মাটিতে ফের বেজে উঠল তোপধ্বনি। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক মল্লরাজবাড়িতে সোমবার ৯টি তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল দেবী মৃন্ময়ী ও বড় ঠাকুরানির পুজো। শতাব্দীপ্রাচীন এই রাজপরিবারের দুর্গোৎসব এবার পা দিল ১০৩০তম বছরে।সোমবার সকালে নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের পর পটে আঁকা দেবী বড় ঠাকুরানির আগমন ঘটে। দেবীর আগমনের বার্তা ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিতে তিনটি পর্যায়ে মোট ৯টি তোপধ্বনি করা হয়। সেই দৃশ্য দেখতে মল্লরাজবাড়ির আশপাশে ভিড় জমান বহু মানুষ।

স্বপ্নাদেশে দেবী প্রতিষ্ঠার কাহিনি : মল্লরাজ পরিবারের সদস্য জ্যোতিপ্রসাদ সিংহঠাকুর জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রথম রাজধানী ছিল জয়পুরের পদ্মঘ্নগড়। পরবর্তীকালে ১৯তম মল্লরাজা জগত মল্ল শিকারে এসে বিষ্ণুপুরের জঙ্গলে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল পোষা বাজপাখি।সেই সময় একটি বককে দেখে বাজপাখিটি সেটিকে ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কথিত আছে, ওই রাতেই রাজা স্বপ্নাদেশ পান। দেবী মৃন্ময়ী তাঁকে জানান, এই মাটির মধ্যেই তাঁর অবস্থান এবং সেখানেই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।পরদিন দেবীর নির্দেশ মেনে রাজা জগত মল্ল দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন বলে মল্লরাজ পরিবারের ঐতিহ্যবাহী বর্ণনায় জানা যায়। পরিবারের দাবি, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত গঙ্গামাটির সেই দেবীমূর্তি আজও অক্ষত রয়েছে এবং সেই বিগ্রহকেই প্রথা মেনে পুজো করা হয়।

মৃন্ময়ীর পাশাপাশি তিন ঠাকুরানির পুজো : মল্লরাজবাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল দেবী মৃন্ময়ীর পাশাপাশি বড়, মেজো ও ছোট ঠাকুরানির আরাধনা। এখানে বড় ঠাকুরানি মহাকালী, মেজো ঠাকুরানি মহালক্ষ্মী এবং ছোট ঠাকুরানি মহাসরস্বতী রূপে পূজিতা হন।পটে আঁকা বড় ঠাকুরানি ইতিমধ্যেই মূল মৃন্ময়ী মন্দিরে প্রবেশ করেছেন। মহালয়ার পরদিন নির্দিষ্ট আচার ও শুদ্ধাচার মেনে মেজো ঠাকুরানির প্রবেশের প্রথা রয়েছে। ষষ্ঠীর দিন মন্দিরে প্রবেশ করেন ছোট ঠাকুরানি।মল্লরাজ পরিবারের সদস্যদের দাবি, পুজোর প্রতিটি আচার আজও তিথি-নক্ষত্র মেনে সম্পন্ন করা হয়।

মহামারির স্মৃতিতে খচ্চরবাহিনী পুজো : মল্লরাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসও। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, অতীতে কলেরা মহামারি আকার ধারণ করত। সেই সময় রোগমুক্তি ও আরোগ্য কামনায় নবমীর রাতে অন্ধকারের মধ্যে খচ্চরবাহিনী দেবীর পুজোর প্রচলন হয়। সেই প্রথা আজও বজায় রয়েছে।

হাতে লেখা পুঁথি মেনেই পুজো : রাজবাড়ির পুরোহিত সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জানান, মল্লরাজবাড়ির পুজো নিজস্ব ‘বলি নারায়ণী’ পদ্ধতি মেনে সম্পন্ন হয়। সেই সময়ের হাতে লেখা পুঁথি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। সেই পুঁথি পাঠ করেই পুজোর বিভিন্ন আচার সম্পন্ন করা হয়।প্রথা অনুযায়ী জিতাষ্টমীর দিন বিকেলে বিল্ববরণ অনুষ্ঠান হয়। সেই রাতে দেবী বেলগাছে অবস্থান করেন বলে বিশ্বাস। পরদিন সকালে স্থানীয় গোপালসায়রে স্নান করানোর পর পটে আঁকা বড় ঠাকুরানিকে মন্ত্রোচ্চারণ ও শুদ্ধাচারের মাধ্যমে মৃন্ময়ী মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়।

রাজবাড়ির পুজোয় পটচিত্রের বিশেষ গুরুত্ব : মল্লরাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে পটচিত্রের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। রাজপরিবারের সূত্রে জানা যায়, মল্লরাজের প্রধান সেনাবাহিনীর এক সদস্য ছবি আঁকতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাঁর আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে রাজপরিবার তাঁকে পুজোর জন্য পট আঁকার দায়িত্ব দেয়। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরেরাই সেই ঐতিহ্য বহন করে আসছেন।মূল মৃন্ময়ী প্রতিমার পাশাপাশি পটে আঁকা বড়, মেজো ও ছোট ঠাকুরানির পুজো তাই আজও মল্লরাজবাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।

সন্ধিপুজোয় তোপধ্বনি, দশমীতে বিশেষ আচার : অষ্টমীর সন্ধিপুজোর সময় তোপধ্বনি মল্লরাজবাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সেই তোপধ্বনি দেখতে বিষ্ণুপুরের মূর্চা পাহাড়ে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম হয়।সন্ধিপুজোর আরও একটি বিশেষ আচার হল রাজবাড়িতে থাকা অষ্টধাতুর বিশালাক্ষ্মী-উগ্রচণ্ডা মূর্তিতে স্বর্ণচাঁপা ফুল দিয়ে রাজঅঞ্জলি প্রদান।দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের পর রামচন্দ্রের পুজো, অপরাজিতা বন্ধন এবং নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা রয়েছে। এরপর দইয়ের মধ্যে চ্যাং মাছ ছেড়ে দেওয়ার বিশেষ আচারের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে মল্লরাজবাড়ির দুর্গোৎসবের।এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই পুজো তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়—বিষ্ণুপুরের ইতিহাস, রাজপরিবারের ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\n\\\\n\\n\\n\n\n