নিজস্ব সংবাদদাতা : ইরানের রাজনীতির ইতিহাসে আলি খামেনেই নামটি এক অনিবার্য অধ্যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিজের দফতরেই নিহত হয়েছেন—এমন দাবি ঘিরে উত্তাল আন্তর্জাতিক মহল। যদিও তেহরান থেকে সরকারি ভাবে নিশ্চিত ঘোষণা এখনও স্পষ্ট নয়, তবু এই খবর সামনে আসতেই বিশ্বরাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার ছায়া নেমে এসেছে। প্রায় ৩৭ বছর ধরে ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন আয়াতোল্লা খামেনেই। রাষ্ট্রপতি পাল্টেছে, মন্ত্রিসভা বদলেছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের লাগাম ছিল তাঁর হাতেই। সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম, নিরাপত্তা সংস্থা—রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধের প্রতীক, বিরোধীদের চোখে কঠোর শাসক। ফলে তাঁর মৃত্যুর খবর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড়সড় পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি বিস্ফোরক।ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে ঘিরে বড় দাবি সামনে এল আন্তর্জাতিক মহলে। কুয়েতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Kuwait Times-এর একটি পোস্টে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। শনিবার এক ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা Reuters-কে জানান, ইরানে চালানো মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই দাবি এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ইসরায়েলের দুটি টেলিভিশন নেটওয়ার্কও একই দাবি সামনে এনেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম Kan 11 তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে স্পষ্টভাবে লেখে, “আলি খামেনি মারা গেছেন।” পাশাপাশি বেসরকারি চ্যানেল Channel 12 একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, “খামেনি মারা গেছেন।”তবে তেহরান থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে উঠলেও, পরিস্থিতি ঘিরে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

ইরান ও ইজরায়েলের সংঘাত নতুন মাত্রা নিয়েছে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ইসরায়েলের জরুরি পরিষেবা সংস্থা Magen David Adom জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল আবিব এলাকায় এক মহিলা নিহত এবং অন্তত ২১ জন আহত হয়েছেন। পাল্টা হিসেবে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় ইরানে কমপক্ষে ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump এই সামরিক অভিযানের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলেন, এটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির হুমকি নির্মূল করার লক্ষ্যে পরিচালিত “বৃহৎ অভিযান”। তাঁর এই মন্তব্যে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তারা মাতৃভূমি রক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, তারা ইজরায়েলের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ, আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই—সব মিলিয়ে বিস্ফোরণের মাটি প্রস্তুত ছিল। এখন প্রশ্ন একটাই—খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে কি ইরান নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে? নাকি আরও কঠোর নেতৃত্ব সামনে এসে পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে?পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের আগুন, দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তে অশান্তি, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তেজনার ঢেউ—সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মোড়ে দাঁড়িয়ে। কেউ মুখে “বিশ্বযুদ্ধ” বলছে না, কিন্তু তার ছায়া কি ধীরে ধীরে আরও ঘন হচ্ছে? বিশ্ববাসী এখন সেই উত্তর খুঁজছে উদ্বেগ আর আতঙ্কের মাঝেই।