নিজস্ব সংবাদদাতা : জালালাবাদ পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতায় চার দিনের টানা অনিশ্চয়তা আর মৃত্যু-ঝুঁকির মাঝেই এগিয়ে চলেছিল একদল তরুণ বিপ্লবী। কাঁধে ভারী মাস্কেট রাইফেল, চোখে অদম্য সাহস—জঙ্গল-পাহাড়ের সরু পথে শত্রু নিধনের প্রস্তুতিতে তারা যেন মৃত্যু নয়, জয়কেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। মাত্র পনেরো-ষোলো বছরের কিশোরদের কণ্ঠেই তখন শোনা গিয়েছিল দৃপ্ত ঘোষণা—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার শপথ।এই সংগ্রামের অন্যতম পরিচিত নাম হরিগোপাল বল, যিনি সহযোদ্ধাদের কাছে টেগরা নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর বড় ভাই লোকনাথ বল ছিলেন নেতৃত্বে। সেই সময় চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একের পর এক তরুণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে।১৯২৯ সালে Subhas Chandra Bose চট্টগ্রাম রাজনৈতিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সময় এই তরুণ বিপ্লবীদের সাহস ও নেতৃত্বের গুণে অনুপ্রাণিত হন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে তাঁদের অনেকেই ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত হন।১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল, Surya Sen-এর নেতৃত্বে মাত্র ৫৪ জন তরুণ বিপ্লবী—যাদের অনেকেই সদ্য কৈশোর পেরিয়েছে—চট্টগ্রামের Jalalabad Hill-এ ব্রিটিশ বাহিনীর এক শক্তিশালী রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হন। সীমিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই অসাধারণ সাহস ও কৌশলে তাঁরা লড়াই চালিয়ে গিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম হন। যুদ্ধক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে ছুটে যাওয়া, শেষ মুহূর্তে বন্ধুকে বিদায় জানানো কিংবা মৃত্যুর মুখেও হাসিমুখে লড়াই চালিয়ে যাওয়া—এইসব দৃশ্য সেই সময়ের বিপ্লবী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে। কেউ শেষ মুহূর্তে সহযোদ্ধাকে বলেছিল, “চললাম, পরে দেখা হবে”—যেন মৃত্যু নয়, এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসই তাদের চালিত করেছিল।বিধু ভট্টাচার্য, নরেশ রায়, দেবপ্রসাদ গুপ্ত—এদের মতো বহু বিপ্লবী ছিলেন এই লড়াইয়ের অংশ। কেউ গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও হাস্যরস করছিলেন, কেউ আবার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সহযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মানবিকতা, বন্ধুত্ব আর দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক অনন্য অধ্যায় তৈরি করেছিল।ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও ভারী ফায়ারপাওয়ারের সামনে সীমিত অস্ত্র নিয়ে লড়াই করছিল এই বিপ্লবীরা। তবুও তাদের অদম্য মনোবল এবং কৌশলগত নেতৃত্বে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।আজ ২২ এপ্রিল, সেই ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধের ৯৬তম বার্ষিকী। ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই অধ্যায় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যায় না।