নিজস্ব সংবাদদাতা : কেষ্টপুর উদয়ন পল্লীর মেয়ে অনুসূয়া হাওলাদার এখন আর শুধু পাড়ার গর্ব নন—তিনি পশ্চিমবঙ্গের উদীয়মান জিমন্যাস্টিক তারকা। অল্প বয়সেই জাতীয় স্তরে একাধিক সাফল্য কুড়িয়ে নিজের প্রতিভার স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। চার বছর বয়সে জিমন্যাস্টিকে হাতেখড়ি, আর সেখান থেকেই শুরু এক নিরলস লড়াইয়ের পথচলা। শৈশবে বাগুইআটির প্রতিবেশী কয়েকজনের অনুপ্রেরণায় জিমন্যাস্টিকে ভর্তি হন অনুসূয়া। ছোট থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল বহুমুখী প্রতিভার ঝলক—যোগা, সাঁতার, আঁকা—সব ক্ষেত্রেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যোগায় নিজের গ্রুপে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মন জুড়ে যায় জিমন্যাস্টিকেই।পরবর্তীতে বারাসাতের ‘সমন্বয়’-এ কোচ রাখি দেবনাথের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শুরু করেন। কোচের কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মিত অনুশীলনের ফলে দ্রুত উন্নতি করতে থাকেন অনুসূয়া। রাজ্য স্তর পেরিয়ে জাতীয় প্রতিযোগিতায় সুযোগ পেতে শুরু করেন তিনি। একের পর এক পদক জিতে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেন। বর্তমানে দেশবন্ধু নগরের প্রমিলা মেমোরিয়াল অ্যাডভান্স স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী অনুসূয়া এখন ভুবনেশ্বরে জাতীয় ক্যাম্পে অনুশীলন করছেন। ২০২৪ সালের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্লোর এক্সারসাইজ বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে নজর কেড়েছিলেন তিনি। অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্কিংয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করে নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। একই বছরে স্কুল থেকেও বিশেষ সংবর্ধনা পান। ২০২৫ সালে ‘দ্য টেলিগ্রাফ স্কুল অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সেলেন্স’-এ সম্মানিত হন অনুসূয়া—যা তাঁর ক্রীড়া জীবনে বড় স্বীকৃতি।চলতি বছরের স্টেট গেমসে অল-রাউন্ড বিভাগে দ্বিতীয় স্থান দখল করেন তিনি। ফ্লোর এক্সারসাইজে প্রথম এবং ব্যালেন্স বিমে দ্বিতীয় হয়ে নিজের সর্বাঙ্গীণ দক্ষতার প্রমাণ দেন। প্রতিদিন বিকেল চারটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত প্রায় পৌনে বারোটায় ফেরা—এই কঠোর রুটিনই তাঁর সাফল্যের ভিত্তি। দীর্ঘ যাতায়াত, কঠিন অনুশীলন, পড়াশোনার চাপ—সব সামলে লক্ষ্য একটাই, দেশের হয়ে সেরার আসনে পৌঁছানো। প্রয়োজনে রবিবারেও অনুশীলন থেকে বিরতি নেন না তিনি।এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বড় সুযোগ এসেছে। জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিতব্য DTB Pokal Stuttgart Junior Team Challenge-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঁচ সদস্যের মহিলা জিমন্যাস্ট দলের অংশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন অনুসূয়া। মহারাষ্ট্র থেকে দু’জন, ত্রিপুরা ও উত্তরপ্রদেশ থেকে একজন করে এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে একমাত্র অনুসূয়াই এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় সুযোগ পেয়েছেন—যা বাংলার জন্য বড় গর্বের মুহূর্ত।অনুসূয়ার বাবা পরিতোষ হাওলাদার জানিয়েছেন, মেয়ের এই সাফল্যের পেছনে কোচ রাখি দেবনাথের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলেন, আর সেই পথেই এগিয়েছে অনুসূয়ার সাফল্যের যাত্রা।পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকা—সকলের গর্ব এখন এই কিশোরী। কিন্তু অনুসূয়ার চোখে এখনও অনেক বড় স্বপ্ন—আন্তর্জাতিক আসরে ভারতের পতাকা উড়িয়ে দেশের জন্য সেরার সম্মান বয়ে আনা। তাঁর লড়াই থামেনি, বরং এখনই শুরু আসল পরীক্ষা।