নিজস্ব সংবাদদাতা : বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ও BSI-এর যৌথ গবেষণায় বড় সাফল্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম নথিভুক্ত ‘রাবণ তাল’!পূর্ব ভারতের উদ্ভিদবৈচিত্র্য গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গবেষকরা। বাঁকুড়া জেলার লক্ষ্মীসাগর এলাকার শুষ্ক পর্ণমোচী অরণ্যে সন্ধান মিলেছে বিরল প্রজাতির শাখাবিশিষ্ট তালগাছ Hyphaene dichotoma-র, যা স্থানীয়ভাবে ‘রাবণ তাল’ নামে পরিচিত। একাধিক শাখায় বিভক্ত কাণ্ডের কারণেই এই নামের প্রচলন বলে মনে করছেন গবেষকরা। এই আবিষ্কার পূর্ব ভারতের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে এক নতুন সংযোজন। এতদিন পর্যন্ত ভারতের গুজরাট, গোয়া, মহারাষ্ট্র এবং দিউ অঞ্চলে এই প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত ছিল। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম স্বাভাবিক পরিবেশে এর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হল। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের Taxonomy and Molecular Systematics Laboratory এবং Botanical Survey of India-এর বিজ্ঞানীরা। গবেষকদলে ছিলেন অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল, রনি সাহা, রাহুল দেব বর্মন, ড. দেবেন্দ্র সিং এবং এম.এসসি. শিক্ষার্থী সুব্রত (এস.) চৌধুরী।

এই গবেষণার সূচনা হয় এক শিক্ষার্থীর কৌতূহল থেকে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এসসি. শিক্ষার্থী সুব্রত চৌধুরী বাঁকুড়ার লক্ষ্মীসাগর এলাকায় একটি অস্বাভাবিক শাখাবিশিষ্ট তালগাছ লক্ষ্য করেন। বিষয়টি তিনি তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডলকে জানান। নমুনা সংগ্রহ ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর শুরু হয় বিস্তৃত মাঠসমীক্ষা, ট্যাক্সোনমিক বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা।দীর্ঘ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে এটি Hyphaene dichotoma প্রজাতির তালগাছ এবং বাঁকুড়া জেলার ওই অঞ্চলে এর একটি স্বাভাবিক ও পুনর্জন্মশীল জনসংখ্যা রয়েছে। পূর্ণবয়স্ক গাছের পাশাপাশি প্রচুর নবীন চারার উপস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, শতাধিক বছর ধরেই এই গাছ ওই অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। অর্থাৎ এটি মানুষের লাগানো নয়, বরং এলাকার প্রাকৃতিক উদ্ভিদসম্পদেরই অংশ।

অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল জানান, এই আবিষ্কার শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, সমগ্র পূর্ব ভারতের উদ্ভিদবৈচিত্র্য গবেষণার ক্ষেত্রেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে Hyphaene dichotoma-র ভৌগোলিক বিস্তৃতি সম্পর্কে নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য যুক্ত হল।উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, Hyphaene dichotoma ভারতের একমাত্র স্বাভাবিকভাবে জন্মানো শাখাবিশিষ্ট তালগাছ। এর কাণ্ড দ্বিখণ্ডিত হয়ে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, যা অন্যান্য তালগাছের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। International Union for Conservation of Nature (IUCN)-এর মূল্যায়নে প্রজাতিটি Near Threatened বা বিপদসীমার নিকটবর্তী হিসেবে তালিকাভুক্ত।গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ছোটনাগপুর মালভূমি সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের অজানা উদ্ভিদসম্পদের গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে, নিবিড় মাঠসমীক্ষা, শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিৎসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্ভব।গবেষকদল এই সাফল্যের জন্য বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গবেষণাবান্ধব পরিবেশ ও সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি একজন এম.এসসি. শিক্ষার্থীর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভিত্তি হতে পারে, সুব্রত চৌধুরীর এই অবদান তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষিত বৈজ্ঞানিক পত্রিকা Rheedea-এর Volume 36 (Issue 2), 2026-এ "Hyphaene dichotoma (Arecaceae): an addition to floristic diversity of eastern India" শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রকাশনা পূর্ব ভারতের উদ্ভিদবৈচিত্র্য গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।