ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট তথ্যের অভাব নয়; সংকট নিরপেক্ষতার অভাব। আমরা ইতিহাস পড়ি খুব কম, কিন্তু ইতিহাসকে ব্যবহার করি খুব বেশি। অতীতকে জানার আগেই তাকে নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। ফলে একজন মানুষ আর মানুষ থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন হয় পূজিত প্রতীক, নয়তো প্রত্যাখ্যাত প্রতিপক্ষ। এই প্রবণতার শিকার আমাদের বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মতামত অনেক সময় তথ্যের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক মঞ্চ সর্বত্র মানুষকে বোঝার চেয়ে তাঁকে শ্রেণিবদ্ধ করার প্রবণতাই যেন বেশি। কেউ যদি আমার বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যান, তবে তিনি নিঃসন্দেহে মহান; আর যদি না মেলেন, তবে তাঁর সমস্ত অবদানও যেন অস্বীকারযোগ্য। এই মানসিকতা শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার করে না; ইতিহাসের প্রতিও অন্যায় করে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায়শই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়েই আটকে যাই। অথচ একটি মানুষকে বুঝতে হলে তাঁর সমগ্র জীবনকে দেখতে হয়। একজন শিক্ষাবিদ, একজন প্রশাসক, একজন সংসদীয় নেতা এবং একজন চিন্তাশীল ভারতীয় এই সব পরিচয় মিলিয়েই তাঁর পূর্ণতা। আমার মনে হয়, আমরা প্রায়ই ইতিহাসের মানুষদের একমাত্রিক করে ফেলি, কারণ বহুমাত্রিক সত্যকে গ্রহণ করার সাহস আমাদের কমে যাচ্ছে।আজকের সমাজের দিকে তাকালে শিক্ষা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল চাকরি? বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কি শুধু কতজন কর্মসংস্থান পেলেন, সেই পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ? নাকি শিক্ষা এমন মানুষ তৈরি করবে, যারা প্রশ্ন করতে শিখবে, ভিন্নমতকে সম্মান করবে এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব অনুভব করবে? শ্যামাপ্রসাদের শিক্ষা-ভাবনা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু শিক্ষা যে জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি এই উপলব্ধি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। একইভাবে রাজনীতির চরিত্র নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কৌশলে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে আদর্শ ধীরে ধীরে অলঙ্কারে পরিণত হয়। আমি মনে করি, যে কোনো গণতন্ত্রে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু মতভেদ যদি বিদ্বেষে রূপ নেয়, তবে গণতন্ত্রের আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সমর্থন বা সমালোচনা— দুই-ই হতে পারে; কিন্তু তাঁকে বোঝার আগে তাঁকে বিচার করার প্রবণতা কখনোই সুস্থ বৌদ্ধিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়। আজ আমাদের সমাজে আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায় আমরা স্মৃতিকে সংরক্ষণ করি না, বরং তাকে নির্বাচন করি। যে ইতিহাস আমাদের সুবিধাজনক, তাকে সামনে আনি; যা অস্বস্তিকর, তাকে আড়াল করি। অথচ ইতিহাসের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা তখনই দেখানো হয়, যখন আমরা তার উজ্জ্বল অধ্যায়ের পাশাপাশি জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকেও সমান সততার সঙ্গে পড়তে শিখি। ইতিহাসের কাজ কোনো ব্যক্তিকে দেবতা বা দানবে পরিণত করা নয়; ইতিহাসের কাজ মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আমাদের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছেন। একটি জাতির আত্মপরিচয় কীভাবে গড়ে ওঠে? শিক্ষা ও রাষ্ট্রচিন্তার সম্পর্ক কোথায়? মতাদর্শ ও জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, কিন্তু প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব কমে না। আজ ভারত উন্নয়নের পথে দ্রুত এগোচ্ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পরিকাঠামো সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দৃশ্যমান। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি যদি বৌদ্ধিক সততা, সহনশীলতা এবং যুক্তিবোধের চর্চা না বাড়ে, তবে সেই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সভ্যতার পরিচয় শুধু উঁচু সেতু বা অট্টালিকায় নয়; সভ্যতার পরিচয় প্রকাশ পায় সে কীভাবে তার ইতিহাসকে পড়ে, ভিন্নমতকে গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দেয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কেবল একটি রাজনৈতিক নাম নন। তিনি এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র, যাঁকে ঘিরে আমাদের নিজেদের মানসিকতারও পরীক্ষা হয়। আমরা কি তাঁকে নিয়ে তর্ক করতে পারি, কিন্তু পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে পারি? আমরা কি তাঁর অবদান ও সীমাবদ্ধতা— দুটোকেই সমান সততার সঙ্গে স্বীকার করতে পারি? যদি পারি, তবে সেটিই হবে ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত সম্মান। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো ব্যক্তির পক্ষ নেয় না। ইতিহাস পক্ষ নেয় সত্যের, যুক্তির এবং মানবিক সততার। আর সেই কারণেই আমি মনে করি, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন তাঁর জন্য নয় আমাদের নিজেদের জন্য। কারণ ইতিহাসকে আমরা যেভাবে পড়ি, শেষ পর্যন্ত তা-ই আমাদের সমাজ, আমাদের রাজনীতি এবং আমাদের ভবিষ্যতের চরিত্র নির্ধারণ করে।