নিজস্ব সংবাদদাতা: অর্জুন গাছের শিকড়, বেতের তন্তু, পলাশ ফুলের পাপড়ি, বাসক পাতার রস— এমনকি বিট, গাজর, আম, জাম, কমলালেবু ও পেয়ারার মতো পরিচিত ফল ও সবজি থেকেও তৈরি হতে পারে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রং। এমনই সম্ভাবনার দিশা দেখাল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ও Botanical Survey of India (বিএসআই)-এর বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণা। গবেষণায় ভারতের প্রায় ৪০০টি প্রাকৃতিক রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই উদ্ভিদজাত রঞ্জক ভবিষ্যতে বস্ত্রশিল্পের পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, চামড়া শিল্প, হ্যান্ডমেড পেপার, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং গ্রিন টেকনোলজির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। গবেষণাটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা Discover Plants-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীপককুমার কর জানান, ভারতের প্রাকৃতিক রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদ নিয়ে এই গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকাশে এই গবেষণার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অমলকুমার মণ্ডল। এর আগে তাঁর নেতৃত্বেই মানবদেহে অস্ত্রোপচারের সেলাইয়ের উপযোগী উদ্ভিজ্জ তন্তু আবিষ্কারের গবেষণা আলোচনায় এসেছিল। তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে তাঁর তত্ত্বাবধানে একদল গবেষক প্রাকৃতিক রঞ্জক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছেন।

প্রথমদিকে গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল জঙ্গলমহলের রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদকে ঘিরে। পরে সেই গবেষণার পরিধি সমগ্র ভারতজুড়ে বিস্তৃত হয়।অধ্যাপক মণ্ডলের কথায়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদ সম্পর্কে এভাবে সমন্বিত বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডার এই প্রথম তৈরি করা হয়েছে। শতাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে সপুষ্পক উদ্ভিদ, নগ্নবীজী উদ্ভিদ এবং লাইকেন-সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্ভিদের তথ্য একত্রিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক রঞ্জকের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, নিষ্কাশন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পক্ষেত্রে এর বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।গবেষণায় ভবিষ্যতের জন্য বিরল রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদের সংরক্ষণ, আধুনিক নিষ্কাশন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশ দূষণকারী কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে উদ্ভিদজাত প্রাকৃতিক রঞ্জকের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, তেমনই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আগামী দিনে প্রাকৃতিক রঞ্জকভিত্তিক শিল্পের বিকাশে এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে বলেই আশাবাদী গবেষকরা।