Skip to content

মৌমাছি বাঁচলে বাঁচবে কৃষি: কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার দেশীয় মৌমাছি?

অর্ণব চক্রবর্ত্তী : মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনকারী একটি উপকারী পতঙ্গ নয়, বরং কৃষি ও পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। বিশ্বের বিপুল সংখ্যক ফল, সবজি, তৈলবীজ এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।তবুও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের কারণে মৌমাছির সংখ্যা ও স্বাস্থ্য উদ্বেগজনকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এর ফলে শুধু মধু উৎপাদন নয়, কৃষি ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৬ হাজার মৌমাছি পালক বিভিন্নভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। কিন্তু তাঁদের অনেকেই পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা, বীমা, সহজ ঋণ, ক্ষতিপূরণ বা নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

একসময় বাংলার গ্রামাঞ্চলে দেশীয় এপিস সেরেনা (Apis cerana) মৌমাছি বাড়ি বাড়ি পালন করা হতো। কিন্তু গত শতকের আশির দশকে থাই স্যাক ব্রুড ভাইরাসসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে এই প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর ধীরে ধীরে এপিস মেলিফেরা (Apis mellifera) বা ইতালীয় মৌমাছির বাণিজ্যিক চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।মেলিফেরা মৌমাছি তুলনামূলকভাবে শান্ত স্বভাবের, বড় আকারের এবং একটি কলোনি থেকে বেশি পরিমাণে মধু উৎপাদন করতে সক্ষম।

তবে এদের সফলভাবে পালন করতে বছরে বিভিন্ন মৌসুমে সরিষা, লিচু, ইউক্যালিপটাস, তিল বা সুন্দরবনের মতো ফুলসমৃদ্ধ এলাকায় বাক্স স্থানান্তর করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ ও শ্রম উভয়ই বৃদ্ধি পায়। বর্ষাকালে প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাবে অনেক সময় চিনি বা গুড়ের দ্রবণ খাওয়ানোরও প্রয়োজন হয়, যা মৌপালকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।অন্যদিকে দেশীয় সেরেনা মৌমাছি তুলনামূলকভাবে চঞ্চল ও আক্রমণাত্মক হলেও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এদের অতিরিক্ত খাদ্য সরবরাহের প্রয়োজন খুব কম এবং বাড়ির আশপাশেই সহজে পালন করা সম্ভব।

আকারে ছোট হওয়ায় এরা ছোট ছোট ফুল থেকেও সহজে পুষ্পরস ও পরাগ সংগ্রহ করতে পারে। ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় উদ্ভিদের পরাগায়নে এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞদের মত।যদিও দেশীয় মৌমাছির মধু উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম, অনেকের মতে এর মধুর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য আলাদা।

তবে এর ঔষধি গুণাগুণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মাননির্ধারণ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।আজ যখন টেকসই কৃষি (Sustainable Agriculture) এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন দেশীয় প্রজাতির মৌমাছি সংরক্ষণ ও মৌপালকদের পাশে দাঁড়ানো সময়ের দাবি। গাছ, প্রাণী, মৌমাছি এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে পারলেই ভবিষ্যতের কৃষি আরও শক্তিশালী ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে।মৌমাছিকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে বাঁচানো নয়; বরং আমাদের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

Latest