Skip to content

তারাপীঠের রথযাত্রার বিরল ঐতিহ্য! জগন্নাথ নন, রথে আরোহন করেন স্বয়ং মা তারা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : ‘জগন্নাথ’ শব্দের অর্থ জগতের নাথ বা বিশ্বনিয়ন্তা। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রথের রশি টেনে পুণ্যলাভের আশায় অংশ নেন রথযাত্রা উৎসবে। তবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের রথযাত্রার মধ্যে বীরভূমের তারাপীঠের রথযাত্রা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ, এখানে রথে আরোহন করেন না জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা; বরং জগন্নাথের প্রতিভূ রূপে রথে বিরাজ করেন স্বয়ং মা তারা। শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক অনন্য সমন্বয়ই এই রথযাত্রার মূল বৈশিষ্ট্য। বিশ্বাস করা হয়, মা তারাই একাধারে কালী এবং কৃষ্ণতত্ত্বের প্রতীক।

এই ‘অভেদ তত্ত্ব’-এরই অনন্য প্রকাশ ঘটে তারাপীঠের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায়।এবারের রথযাত্রায় আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরনো রথের দুটি চাকা এবং ধুরি (অ্যাক্সেল) অক্ষত রেখে সেগুন কাঠ দিয়ে নির্মিত নতুন রথে বিরাজ করবেন মা তারা। ফলে ঐতিহ্য রক্ষা এবং আধুনিক নির্মাণ—দুইয়েরই সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে এবারের আয়োজনে।বৃহস্পতিবার হওয়ায় ভক্তদের ভিড় ছিল আরও বেশি। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবগুরু বৃহস্পতিরও গুরু হিসেবে দেবী তারাকে মানা হয়। সেই কারণেই সপ্তাহের এই বিশেষ দিনে তারাপীঠ মন্দিরে ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রায় আড়াইশো বছর আগে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সাধক দ্বিতীয় আনন্দনাথ নাটোরের রাজা তথা তৎকালীন তারাপীঠ জমিদার সাধক রামকৃষ্ণের সহযোগিতায় এই ব্যতিক্রমী রথযাত্রার সূচনা করেন। পরে মহাশ্মশানের প্রখ্যাত সাধক বামাক্ষ্যাপা এই উৎসবকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।তারাপীঠ মন্দিরের গবেষক ও সেবাইত প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সাধক বামাক্ষ্যাপা নিজেই রথের দড়ি টেনে ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে ভক্তদের সঙ্গে রথযাত্রায় অংশ নিতেন। সেই সময় গোরুর গাড়ির চাকা লাগানো কাঠের রথে দেবী তারাকে বসিয়ে তৎকালীন চণ্ডীপুর, বর্তমান তারাপীঠ গ্রাম পরিক্রমা করানো হতো।পরবর্তীকালে ভক্ত আশালতা সাধুখাঁ-র উদ্যোগে তারাপীঠে রথঘর নির্মিত হয়, যার উদ্বোধন করেছিলেন ১৯৭০ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়। সময়ের সঙ্গে কাঠের রথের পরিবর্তে পিতলের রথ ব্যবহৃত হলেও, এবার সেগুন কাঠ দিয়ে নির্মিত নতুন রথে দেবীর যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।তারাপীঠ মন্দির কমিটির সম্পাদক জানান, এই প্রথম রথযাত্রা উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মন্দির কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে এবারের রথযাত্রা আরও জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে।রথযাত্রা উপলক্ষে সকাল থেকেই মন্দির চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় ভক্তদের ঢল নামে। সন্ধ্যার পর সেই ভিড় আরও বাড়ে। বিপুল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা অন্য কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকেও বিশেষভাবে সতর্ক রাখা হয়েছে।শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শাক্ত-বৈষ্ণব মিলনের বিরল নিদর্শন হিসেবে তারাপীঠের এই রথযাত্রা আজও দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটকের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ হয়ে রয়েছে।

Latest