আহমদ হুসাইন লস্কর, আসাম : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটি আজও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবহেলিত বলে অভিযোগ উঠেছে। কবিপ্রেমী, গবেষক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলির দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।সম্প্রতি চুরুলিয়া সফরে গিয়ে দেখা যায়, কবির পৈতৃক ভিটে এবং জন্মস্থানের একাধিক অংশে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু পুরনো স্থাপনা ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। ফলে দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটক ও গবেষকদের অনেকেই প্রত্যাশিত পরিবেশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন।স্থানীয়দের মতে, চুরুলিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা থাকলেও সেই উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং নজরুল-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির সমন্বিত উদ্যোগে জন্মভিটে ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির দ্রুত সংস্কার করা উচিত।এলাকার এক বাসিন্দা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, অভিযোগ করেন যে কবির জন্মভিটে সংলগ্ন নজরুল একাডেমি-র সংগ্রহশালায় একসময় কবির ব্যবহৃত তানপুরা, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, পাণ্ডুলিপি এবং পদ্মভূষণ-সহ একাধিক মূল্যবান স্মারক সংরক্ষিত ছিল। সংস্কারের কারণ দেখিয়ে সেগুলি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও সংস্কারকাজ দৃশ্যমান নয় বলে তাঁর দাবি। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণেই রয়েছে কবির সহধর্মিণী প্রমীলা দেবীর সমাধি। এছাড়া কাছেই রয়েছে কবির শৈশবের পাঠশালা, খেলার মাঠ, পুরনো মসজিদ এবং ব্যবহৃত পুকুর। স্থানীয়দের মতে, এই ঐতিহাসিক স্থানগুলিরও যথাযথ সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যায়ন প্রয়োজন।

এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে নির্মিত যুব আবাস সারা বছর পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মূলত নজরুল মেলার সময় বুকিং নেওয়া হয়, বছরের বাকি সময় ভবনটি অধিকাংশ সময় বন্ধই থাকে। এতে পর্যটন সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।সাহিত্যপ্রেমীদের মতে, যেমন শান্তিনিকেতন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান চুরুলিয়াকেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।কবির স্মৃতি, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে চুরুলিয়ার জন্মভিটে ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির দ্রুত সংস্কার, সংরক্ষণ এবং আধুনিক পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের অন্যতম দাবি বলে মনে করছেন নজরুলপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষেরা।