বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে বীরসিংহে উন্নয়নের বার্তা, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে ১২০০ কোটি!
সুমন মণ্ডল, ঘাটাল: বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ১২ আশ্বিন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে বুধবার বিদ্যাসাগরের জন্মভিটে বীরসিংহে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঘাটাল মহকুমার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সফরকে ঘিরে বীরসিংহে ছিল উৎসবের আবহ। একইসঙ্গে বন্যাকবলিত ঘাটালের মানুষের সমস্যার কথাও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে।হেলিপ্যাডে অবতরণের পর গাড়িতে করে বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান তিনি। এরপর বিদ্যাসাগরের বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ভগবতী দেবীর মূর্তি উন্মোচন করেন। পরে বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে আয়োজিত মূল সভায় বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী।
বীরসিংহে একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ : সভা থেকে বীরসিংহ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করা হয়।সিংহডাঙা থেকে বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তায় সোলার স্ট্রিট লাইট বসানোর জন্য ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগর শিশু উদ্যানের বড় পুকুরের পাড় সৌন্দর্যায়নে ৩৫ লক্ষ টাকা এবং নতুক হেলথ সেন্টার উন্নীতকরণে ৪০ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়।এছাড়াও বীরসিংহে নারায়ণচন্দ্র খিড়কি পুকুর স্মৃতি মন্দির পর্যন্ত গার্ডওয়াল ও কংক্রিটের হাঁটার রাস্তা তৈরিতে ৫০ লক্ষ টাকা, মমরাজপুর ICDS কেন্দ্র থেকে অর্জুনআরি শিবতলা মন্দির পর্যন্ত কংক্রিটের রাস্তা তৈরিতে ৭৪ লক্ষ টাকা এবং বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়ের ACR বিল্ডিং নির্মাণে ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে।ঘাটালের পাঁশকুড়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় BSDA/ডেভেলপমেন্ট অথরিটির উদ্যোগে মার্কেট কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি হল তৈরির জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

গবেষকদের জন্য আবাসন, পর্যটনে জোর : বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গবেষণার কাজে বীরসিংহে আসা গবেষকদের থাকার জন্য পর্যটন দফতরের উদ্যোগে আবাসিক ব্যবস্থা ও কটেজ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে পর্যটন দফতরকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সভায় জানান তিনি।

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে ১২০০ কোটি : ঘাটালের দীর্ঘদিনের দাবি ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়েও এদিন বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এই প্রকল্পের জন্য ১২০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশ ভারত সরকার এবং বাকি ৫০ শতাংশ রাজ্য সরকার বহন করবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতর থেকেও অর্থ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।জমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে চলছে বলেও জানান তিনি। বর্ষার পর দ্রুত কাজ শুরু করে আগামী জুন মাসের মধ্যে যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘাটালের মানুষকে বারবার বন্যার কবল থেকে রক্ষা করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

কাঁচা বাড়ির জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা : বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা বাড়িগুলির জন্যও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়। জেলাশাসককে BDO-দের সহযোগিতায় বন্যাপ্রবণ এলাকার সমস্ত কাঁচা বাড়ির তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিধায়কদের পাশাপাশি পুলিশের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী জানান, যেসব বানভাসি পরিবারের পাকা বাড়ি নেই এবং আবাস প্রকল্পের বাড়িও তৈরি হয়নি, সেই কাঁচা বাড়ির উপভোক্তাদের ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

কৃষকদের ক্ষতিপূরণেও নির্দেশ : বন্যায় কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। যেসব এলাকায় গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার আওতায় শস্য বীমা শিবির করে কৃষকদের নাম নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।পান বরজ, সবজি এবং আমন ধানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার কথাও জানান তিনি।

পাঁশকুড়া-ঘাটাল রেললাইন নিয়েও আশ্বাস : এদিনের সভায় উঠে আসে পাঁশকুড়া থেকে ঘাটালের ইড়পালা পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পের প্রসঙ্গও। জমি সংক্রান্ত বিষয় দ্রুত মেটাতে জেলাশাসক ও ADM (Land)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের এই রেল যোগাযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘাটালের মানুষের রেল পরিষেবার স্বপ্ন পূরণের আশ্বাসও দেন তিনি।বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে বীরসিংহের মঞ্চ থেকে একসঙ্গে বন্যা মোকাবিলা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা উঠে এল। এখন ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন কত দ্রুত শুরু হয়, সেদিকেই নজর ঘাটালবাসীর।