শস্য ও সন্তানের সমৃদ্ধির কামনায় জঙ্গলমহলে করম পরব, মাতল কুড়মি সমাজ!

শস্য ও সন্তানের সমৃদ্ধির কামনায় জঙ্গলমহলে করম পরব, মাতল কুড়মি সমাজ!

নিজস্ব সংবাদদাতা : শস্যের সমৃদ্ধি, পরিবারে সুখ-শান্তি এবং সন্তানের মঙ্গল কামনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জঙ্গলমহলজুড়ে পালিত হল ঐতিহ্যবাহী করম পরব। পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া-সহ জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই উৎসবকে ঘিরে দেখা যায় উৎসাহ-উদ্দীপনা। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর, মেদিনীপুর সদর ও শালবনী ব্লকেও সন্ধ্যায় নিয়ম-রীতি মেনে পালিত হয় করম পুজো।মূলত আদিবাসী কুড়মি সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসব প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয়।

কর্ম ও সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত এই উৎসবকে কোথাও কোথাও ‘কর্মা’ নামেও পরিচিত। করম পরব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, জঙ্গলমহলের মানুষের জল, জমি ও জঙ্গলকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং কৃষিনির্ভর সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, অসম ও ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় করম উৎসব পালিত হয়। কোথাও মূল পরবের তিন দিন, কোথাও পাঁচ, সাত কিংবা নয় দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় উৎসবের প্রস্তুতি। এবারের মূল উৎসব পালিত হচ্ছে ২২ সেপ্টেম্বর। করম পরব উপলক্ষে রাজ্য সরকারের তরফেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।মেদিনীপুর শহর করম পরব কমিটির অন্যতম সদস্য তথা শিক্ষক বিপ্লব মাহাতো বলেন, “করম পরব আমাদের আদিবাসী কুড়মি সমাজের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পরবের মধ্য দিয়ে কৃষি শিক্ষা এবং কিশোরীদের নারী হয়ে ওঠার সামাজিক শিক্ষারও একটি দিক রয়েছে।”

কীভাবে পালিত হয় করম পরব? করম পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি হল ‘জাওয়া’ বা ‘বালি তোলা’। বাঁশের তৈরি পাত্রে বিভিন্ন ধরনের শস্যের বীজ রাখা হয়। তার আগে বীজে হলুদ মাখানোর রীতি রয়েছে। এরপর কয়েক দিন ধরে সেই বীজের পরিচর্যা করা হয়। হলুদ জল দেওয়া, গান গাওয়া এবং নাচের মাধ্যমে জাওয়াকে ঘিরে চলে নানা আচার।এই সময় কুমারী মেয়েদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট রীতিতে তাঁরা জাওয়ার চারপাশে প্রদক্ষিণ করেন এবং নাচ-গানে অংশ নেন। যাঁর দায়িত্বে জাওয়ার পরিচর্যা থাকে, তাঁকে ‘জাওয়ার মা’ হিসেবে সম্মান করা হয়। উৎসবের কয়েক দিন তাঁকে বিভিন্ন নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং অন্যান্য আচারেও থাকে নানা বিধিনিষেধ। পুজোর দিন অনেকেই নির্জলা উপবাস পালন করেন।পুজোর পরদিন সকালে জাওয়া থেকে অঙ্কুরিত শস্য তুলে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন মেয়েরা। সেই অঙ্কুরিত বীজ বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার রীতিও রয়েছে। কৃষিজীবনে নতুন ফসল ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবেই এই জাওয়াকে দেখা হয়।করম পরবের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক রীতি হল ‘করমসখী’ সম্পর্ক। পুজোর শেষে মেয়েরা পরস্পরের হাতে করমডোর বা রাখি পরিয়ে আজীবন একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। এই সম্পর্ক শুধু উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।আধুনিকতার প্রভাব সত্ত্বেও জঙ্গলমহলের গ্রামগুলিতে করম পরব আজও নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। নাচ, গান, আচার-অনুষ্ঠান এবং কৃষিজীবনের নানা প্রতীককে ঘিরে এই উৎসব তাই কুড়মি সমাজের কাছে শুধু একটি পুজো নয়, বরং তাঁদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাণের পরব।