SIR বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের অভিযোগ, স্বচ্ছতার দাবি প্রাক্তন কমিশনারদের!
নিজস্ব সংবাদদাতা : ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে এবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মতপার্থক্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশনে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি গত ১০ মাসে একাধিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল ভোটার তালিকা পরিচালনা, নতুন ভোটার নথিভুক্তির Form 6-এ পরিবর্তন এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ।তবে এই অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সদস্যদের মধ্যে মতামতের পার্থক্য কোনও অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কমিশনের দাবি, অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও মতবিনিময় প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ এবং SIR-সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সদস্যদের একাংশ প্রকাশ্যে আরও স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি এবং প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা দুজনেই বলেছেন, বর্তমান বিতর্কের অবসানে সংশ্লিষ্ট নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কুরেশির প্রস্তাব, তিন নির্বাচন কমিশনারেরই সাংবাদিক বৈঠক করে SIR নিয়ে তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা উচিত।কুরেশির বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে যদি গুরুতর আইনি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনও পর্যায়ে ভুল বা অনিয়ম হয়ে থাকলে আইনসম্মতভাবে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।অন্যদিকে অশোক লাভাসা প্রশ্ন তুলেছেন, SIR-এর সময় Form 6-এ পরিবর্তন এবং ERO-Net ব্যবস্থায় পরিবর্তনগুলি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে করা হয়েছিল কি না। তাঁর বক্তব্য, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি বা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে Electoral Registration Officer বা ERO-দের যে বিধিবদ্ধ ক্ষমতা রয়েছে, কোনও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই ক্ষমতা সীমিত হয়েছে কি না, তা নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট করা উচিত।লাভাসা আরও বলেছেন, দুই নির্বাচন কমিশনার যদি কোনও বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে থাকেন, সেই আপত্তিগুলি কমিশনের বিবেচনায় এসেছিল কি না, নথিভুক্ত হয়েছিল কি না এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—তার পূর্ণ তথ্য প্রকাশ্যে আসা দরকার। তাঁর মতে, অভিযোগগুলি সঠিক হলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করে; আর অভিযোগগুলি সঠিক না হলে নির্বাচন কমিশনের তরফেই তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।SIR বিতর্কের সঙ্গে ফের সামনে এসেছে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের ঘটনাও। সে সময় নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অশোক লাভাসা কয়েকটি নির্বাচনী আচরণবিধি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ভিন্নমত নথিভুক্ত করেছিলেন। বর্তমান বিতর্কে সেই অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে।প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ওপি রাওয়াতও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি SIR ঘিরে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।এদিকে গোয়ার একটি ঘটনাও বিতর্কে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৯৭ জন ভোটারকে স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য বলে বিবেচনা করা হলেও সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এই ধরনের ঘটনায় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং ERO-দের বিধিবদ্ধ ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।সব মিলিয়ে SIR নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, কমিশনারদের মতপার্থক্য, Form 6 পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি এবং ERO-দের ক্ষমতা—একাধিক প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে। কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, মতামতের পার্থক্য থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের সম্মিলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন মূল প্রশ্ন—কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ নথি কতটা প্রকাশ্যে আসে।